চিঠিমিত্র
রুনা বন্দ্যোপাধ্যায়
- পত্রিকার নাম Journey90s।
সৃষ্টিছাড়া গোত্রছাড়া
নাম। হবে নাই বা কেন?
পত্রিকার উদ্দেশ্যটাই
তো গোত্রছাড়া।
মূলধারার সাহিত্য নিয়ে
নয়; বরং সংখ্যালঘু একলা
চলো-র দলকে খুঁজতে
বেরনোই এর উদ্দেশ্য।
আশির দশক থেকে মূলধারার
পাশাপাশি যে সমান্তরাল
সাহিত্যের স্রোতটি
ক্রমশ উছলে উঠছিল,
“তারই ট্রিবিউটারি
কন্ট্রিবিউটারি ফোর্স
Journey90s, ৯য়া উদ্দ্যোগ।“
পত্রিকার উদ্দেশ্য আরো
একটু বুঝে নিতে আসুন
সম্পাদকীয় কলমটা একটু
নেড়েচেড়ে নিই,
“Journey90s,
কোন দিকে?
কবিতার স্ফুরণ ও সম্ভাবনার দিকে।
যা অনুক্রম ও আবহমানের তার থেকে মুক্তির দিকে...“
কোথায় আছে এই সম্ভাবনা? নিয়মের নিগড়ে বাঁধা এই ভূমন্ডলের মধ্যে লক্ষ্য করলে দেখতে পাই সুশৃঙ্খল বৃষ্টিবিন্দুর মধ্যবর্তীতে মুখ রাখে রাশিবিজ্ঞানের সম্ভাব্যতা। আর নতুন আছে ওই সম্ভাব্যতার হাতে। আবহমানের দর্শনবিন্দুর ঠিক নিচে জল গলছিল। গলতে গলতে উথাল পাথাল। অনুক্রমের সেই ধারা বা চলন থেকে মুক্তি কামনা করে, নতুন কবিতা যখন বাংলা সাহিত্যাকাশে এক স্বতন্ত্র দৃষ্টির উদ্দাম চারুকলা নিয়ে মাতাল, তখন ধারামুক্ত কবিতাভাবনা নিয়ে মুক্তধারার সাহিত্য ও সাহিত্যসেবিদের আলাপ-আলোচনার আহবান করল Journey90s অনলাইন পত্রিকা। আর সেই ভাবনারই যাত্রাপথ আঁকা হল Journey90s-র প্রথম সংখ্যাটিতে।
প্রথম সংখ্যাটিতে আমরা পেয়েছি কিছু গুরুত্বপূর্ণ কবিতা সম্পর্কিত গদ্য। নতুন কবিতার জনক কবি বারীন ঘোষাল “নতুন কবিতার গন্তব্য”-টির খোঁজ দিলেন।
“গন্তব্যটি কি বৈষয়িক, বাস্তবিক, দার্শনিক না কাব্যিক?”
বৈষয়িক গন্তব্যের অস্তিত্ব স্বীকার করেও নতুন কবিতার সঙ্গে তার গাঁটছড়ার কথা অস্বীকার করেছেন। বাস্তবিক গন্তব্য নিয়ে বলতে গিয়ে তাঁর অনুপম গদ্য কবিতার স্বরূপটিকেই মেলে ধরেছে বারীনীয় ভাষায়,
“কবিতা তো কোনো কঠিন বা তরল বস্তু না। বরং তা অলীক, বায়বীয় বলা যায়...... তার কোনো বাস্তবিক গন্তব্য থাকতে পারে না। তার কোনো স্থান কাল অবস্থার মাপক নেই। শব্দ সমষ্টির ধ্বনির আবহে ও ব্যঞ্জনায় তার অলীক ব্যবস্থা করেন নতুন কবিতার কবি। বলা যায় অলীক কবিতার গন্তব্যটিও অলীক।“
এভাবেই দার্শনিক ও কাব্যিক গন্তব্যেরও খোঁজ করেছেন বারীন ঘোষাল তাঁর যুক্তিঋদ্ধ গদ্যকলমের মধ্যে দিয়ে।
নতুন কবিতা নিয়ে সম্পাদকের প্রশ্নাবলীর উত্তর দিতে গিয়ে সমান্তরাল ভারতীয় সাহিত্যের প্রতিনিধি আর্যনীল মুখোপাধ্যায় বললেন,
“নতুনের ধারণাটাও ঔপনিবেশিক। এ অসুখ আমাদের সাহেব ধরিয়ে দিয়ে গেছে। চায়ের নেশার মতো, হইস্কির মতো, ভারতবর্ষের নিজের কোন মদ নেই কয়েকশো বছর হয়ে গেলো ...আমরা নতুনের দাস। যার হাতে সেই নতুন, একটু ঘষলেই আমরা ধোঁইয়ার কুন্ডলি ভেদ করে তার সামনে এসে দাঁড়াচ্ছি, অর্ডার নিয়ে যাচ্ছি নতুনের। নতুনের বানিয়া আমরা। নতুন বানায় যারা।“
কীভাবে মূলধারার কবিতা থেকে নতুন প্রজন্মের কবিতা অন্যকবিতা হয়ে উঠছে, স্বতন্ত্র হয়ে উঠছে তারই আভাষ পাই আর্যনীলের লেখায়। কবি আশা করেন বিশ্বজোড়া বিছানো জাল এবং নতুন প্রযুক্তির প্রেস পদ্ধতির মাধ্যমে এই নিঃশব্দ কবিতা আন্দোলন একদিন ছড়িয়ে পড়বে দিকে দিকে, নতুনের আকাশ জুড়ে ধারামুক্তির আলোয় আলোয়।
মনে পড়ে সেই আদ্যন্ত রোমান্টিক কবি স্বপন রায়কে? সেই ‘সুচিত্রা-বার্মুডা’? সেই “হ থেকে রিণ”? তাঁর কবিতাভাবনাগুলো জানতে হলে আসুন Journey90s –এর প্রথম সংখ্যায়, “নতুন কবিতা যেখানে থাকে” গদ্যটির অভ্যন্তরে চোখ পেতে বসুন,
“আজ যা পুরনো কাল তা নতুন ছিল। আজকের তুমি বা গতকালের তুমি আগামীকালের নিরিখে পুরনোই তো? এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে কেন যে অস্বাভাবিকতা দিয়ে থাকি আমরা! কেন যে এই সাধ অমরত্বের! ‘নতুন কবিতা’ নতুন লেখা কবিতাটি নয়, এটা এখন আর বলে দিতে হয় না। নতুন কবিতা উচ্চারিত হলেই বিষয়হীনতা, অতিচেতনা, পরাবাস্তবতাকে অস্বীকার করা, চিত্রকল্প বর্জন করে ভাষাবদল, শব্দজোড়, ধ্বনিচিত্র, ইত্যাদির সাহায্যে কবিতাকে অন্যতরতায় নিয়ে যাওয়া ইত্যাদি প্রতিষ্ঠা পেতে থাকে। নব্বইয়ের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত বহু গদ্যে, তর্কে, বিতর্কে, তর্কাতীত ভাবে কবিতায় ‘নতুন’ ক্রমশ সময়ের দিকে চলে গেছে।
নদী যেভাবে যায়, বিলীন হতে।
নতুন কবিতাও ক্রমশ কবিতার সমুদ্রে চলে যাবে”
কবি ধীমান চক্রবর্তী, সেই “মোরামে, ফাল্গুনে”-র কবিতাকার; যিনি বিশ্বাস করেন সময় বলে কিছু হয় না। তাই বুঝি অহেতুক সময়গুলো গুঁড়ো গুঁড়ো করে রংছুট ঘড়ির অসময়ে মিশিয়ে দিতে দিতে কবি হিসেব করতে চেয়েছিলেন আঙুলরা টিকটিক করে কখন? Journey90s –এর প্রথম সংখ্যায় কবি ধীমান চক্রবর্তীর কবিতাভাবনা “তা তা থৈ থৈ... তা তা থৈ থৈ / কোথাও থেমো না সই” থেকে দু-এক টুকরো,
“কবিতা এক ক্রমাগত চলন, ভ্রমণ বা জার্নি – একথা আমি বিশ্বাস করি বলে, নতুন কবিতার কোনও গন্তব্যে পৌঁছনোর দায় নেই। এই চলন বা জার্নি থেকে যাবে চিরটাকাল, যতদিন মানুষ থাকবে। এইমাত্র একজন যা লিখে উঠলেন তাকে নতুন কবিতা বলা যাবে না বলেই আমার বিশ্বাস। ঐ কবিতার পাঠ শেষ হলে দেখা যাবে তা হয়তো পুরনো, চালু, গতানুগতিক কবিতার রিমেক। নতুন কবিতার কাছে অন্যতর অনুভব এবং স্ট্রাকচার, চেতনা একে বিগঠিত এবং পুনরায় গঠন করে।“
কবিতার গন্তব্য ভাবনায় ধীমান চক্রবর্তীর সঙ্গে মিল পাচ্ছি বারীন ঘোষালের সঙ্গে। আবার নতুন কবিতার সংজ্ঞা মিলেমিশে গেল কবি স্বপন রায়ের সঙ্গে। নতুনের পথে, চিন্তাভাবনায়, কবিদের চলনে বয়ানে যে মিলগুলো পেতে থাকি তা নতুন নিয়ে আমাদের দ্বন্দ্ব দূর করে, আকৃষ্ট করে ওই নতুনের দিগন্তে।
কবিতার ট্রেকিং-এ কবিতা নিয়ে এক নতুন ভাবনা। কাকে বলে ট্রেকিং অফ পোয়েট্রি? কবি রাজর্ষি চট্টোপাধ্যায়ের অনুপম গদ্য “মাউন্টেন গ্রোস, গ্রোস এলং ভার্জিনিটি”-তে তারই আভাষ,
“কবিতার ট্রেকিং হল কবিতাকে নিয়ে বাইরে বেরোন। হাঁটাযোগ বিষাদবিয়োগ ট্রেকিং-এ কবিতা-ই একমাত্র ধ্বনি, মণি বা হৃৎস্পন্দন। “
রোহণ কুদ্দুস, খুবই পরিচিত এক নাম। আন্তর্জালে বাংলাভাষার সাহিত্যকে ছড়িয়ে দেবার এক অসামান্য কারিগর তিনি। তবু সেটাই তাঁর প্রধান পরিচয় নয়। তিনি কবি আর তাই বুঝি তাঁর কবিতাভাবনায় শোনা যায় প্রকৃত কবির আক্ষেপ, যার অন্তরে আছে এক অতৃপ্ত কবি হৃদয়ের অন্তর্লীন সৌন্দর্য,
“সেটাই কবিতা আমার কাছে এদ্দিনেও যা লেখা হয়ে উঠলো না। তাহলে মাথার মধ্যে ঝিলিক দিয়ে ওঠে যা চমকের মত? সেগুলো কিছু শব্দ আর বাক্য হয়ে লেখা হয়ে গেছে বটে। হঠাৎ করে লিখব বলেও লেখা হয়েছে আরও কিছু। তবু কবিতা (আরও ভালো করে বললে নতুন কবিতা) বলে লেখার ভান করলাম যা কিছু... কিচ্ছু হয়ে উঠলো না সেগুলো।“
আরো অজস্র নতুন কবিতার কারিগরের দেখা মিলবে এই পত্রিকার পাতায়। প্রতিষ্টিত কবিদের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের হাত ধরেছে এই পত্রিকা; আছে অনিন্দ্য রায়, অতনু বন্দ্যোপাধ্যায়, শমিত রায়, ইন্দ্রনীল ঘোষ, কৌশিক চট্টোপাধ্যায় ইত্যাদি। তাঁদের কাছে জানা গেলো তাঁদের কবিতাভাবনা। তাঁদের নতুন কবিতার সম্ভারে সুন্দরভাবে সেজে উঠতে দেখি পত্রিকাটির পরবর্তী সংখ্যাও।
কামনা করি নতুনের দিগন্তে সৃষ্টিশীলতার পথে Journey90s এর এই যাত্রা অব্যাহত থাকুক। জয় হোক তার ভিন্ন সংকল্প ভিন্ন দর্শন ভিন্ন মাত্রার ভাবনাগুলি। কবিতার দূরতম দ্বীপ থেকে ডাক উঠুক নতুন কবির অন্তরমহলে; আর সেই অচিন পথের দূরগম্য দ্বীপে আকাশের আধখানা নীলে ডানা মেলুক নতুন কবিতা।


আপনার মতামত (সম্পাদকের অনুমোদনের পর প্রকাশিত হবে)