কবিতা ও চলচ্চিত্র

কবিতা ও চলচ্চিত্রঃ ৯ম কিস্তি

দেবাঞ্জন দাস



ফাটাকে ফাটা মাঠকে মাঠ
ম্যাডাম টুসকি জুড়োচ্ছে
এ দলমার এক ঘরানা
নিক্‌লে ফির ভি কম নিক্‌লে
নিকেল হওয়ার আগে
পাখিই হতে চেয়েছিল ধাতু
স্ল্যাগে কার আগেকার কুহু
ফাড় দিয়া বস ফাড় দিয়া

‘ল্যাব রিপোর্ট’/ ‘রঙপা’/ “জুলাইওয়ালা”/ ইন্দ্রনীল ঘোষ/ নতুন কবিতা প্রকাশনী/ কলকাতা/ ২০০৯

‘জুলাইওয়ালা’-তে একটা ফ্লাই পেজ দিয়ে সম্পূর্ণ আলাদা করা রয়েছে এই ‘ল্যাব রিপোর্ট’। চার ফর্মার বইতে সাত পাতার এক পৃথক নির্মাণ। যেন এক ধ্বনি ঝড় উঠেছে। মনে হয় কবি এক পঙক্তি থেকে অন্য পঙক্তিতে এগিয়ে যাওয়ার সময় কিছুক্ষেত্রে ধ্বনিগত সাযুজ্য ছাড়া কোন নিয়ন্ত্রণ রাখেনি। কেমন মনে হয় .. এ যেন জাম্প কাটের দুনিয়া চলছে ! চেয়ার থেকে উঠে, ডানদিকে ঘুরে, দু’পা হেঁটে গিয়ে, শু পরে নিয়ে বাইরে বেরোনোর ছায়া-সুনিবিড় সাযুজ্য ‘ফাড় দিয়া বস ফাড় দিয়া’।
বারীনদা (ঘোষাল) ‘গিনিপিগ’ প্রসঙ্গে বলছিলেন – “উলটে পালটে .. মন্তাজ .. হ্যান-ত্যান .. এসমস্ত নানা কথা, এলোমেলো পরের পর যা এসেছে ... কিচ্ছু সাজানো না” এবং সেখান থেকে ‘নতুন কবিতা’ ও চলচ্চিত্রের এক যৌথতার কথা বলছিলেন। কিন্তু “গিনিপিগ একটি তথ্যচিত্র” এই শিরোনাম তখনও আমাদের বেশ কিছু প্রশ্ন তুলে দিয়ে যাচ্ছে। ‘নতুন কবিতা’র “বারীনডাঙা” বইতে ইন্দ্রনীল ঘোষ ও নবেন্দু বিকাশ রায় একটা যৌথ কাজ করেছিল – “একটা ফুলদানি রাখার সাহস”। নবেন্দু সেখানে ‘গিনিপিগ’ সম্পর্কে একটা দারুণ মজার কিন্তু ভীষণ প্রাসঙ্গিক কথা লিখেছিল – “যখন প্রথমবার ‘গিনিপিগ, একটি তথ্যচিত্র’ এই নামটা পড়েছিলাম তখন থেকেই আমার বারবার মনে হত নিশ্চয়ই লেখক গিনিপিগ বলতে কবিতাকে মিন করেছেন”। সেদিনের বারীনদার সাথে আড্ডায় আমি আর অর্জুন (বন্দ্যোপাধ্যায়) সরাসরি সেই প্রসঙ্গে চলে এলাম –

অর্জুন: বারীনদা গিনিপিগ পড়তে গিয়ে যেসব জিনিস আমার বারবার মনে হয়েছে .. প্রথমত প্রশ্ন জেগেছে যে এই তথ্যচিত্র কথাটা নামের মধ্যে কেন ? তুমি তো বললে যে ‘গিনিপিগ, একটি তথ্যচিত্র’ এই নামটা তুমি লেখার পরে দিয়েছ। টেক্সটটা লেখার পরে তুমি নাম দিয়েছ। আমি টেক্সটই বলছি এটাকে। তো এই তথ্যচিত্র নামটা তুমি কেন দিলে ? এটা একটা বিষয়। আর দ্বিতীয় বিষয় হচ্ছে যে তথ্যচিত্র তো ফিল্মের একটা জায়গা .. ফিল্মের টেকনিক্যাল জায়গাগুলো আমি ভালো জানিনা কিন্তু আমার যেটা প্রশ্ন ... ধর এখান থেকে সাইকেল চালিয়ে একটা জায়গায় গেলাম। এই যাওয়ার দৃশ্যটুকু আমার গদ্যে লেখা .. কবিতায় লেখা .. বর্ণনা দেওয়া যা ... ফিল্মে সেই যাওয়াটুকুকে দেখানো ঠিক একই রকম নয়। তার সময় যে .. স্প্যান একই রকম নয়। তার ভাষা, তার প্রকাশ একদম আলাদা। তুমি এই দুটোকে গিনিপিগে কীভাবে মেলাতে পারলে বা মেলাতে চাওনি হয়ত .. আমার মনে হয়েছে মেলাতে চাওনি। আমার মনে হয়েছে তুমি বইটাতে বহু জায়গায় ফিল্ম এই মাধ্যমটাকে হ্যাঁটা করেছ। এটা কীভাবে ?

দেবাঞ্জন: আমি জাস্ট আর একটু এ্যাড করছি অর্জুনের কথাতে .. অর্জুনে যে কথাটা বলল – ফিল্মকে হ্যাঁটা করতে চেয়েছ বা ফিল্ম মিডিয়াম সম্পর্কে তোমার কমেন্ট যদি এ’ভাবে ভাবি তাহলে আমার সবসময় মনে হয়েছে তুমি একজন কবি, লেখক হিসেবে ফিল্মকে কীভাবে দ্যাখো, তার টেকনিক ইত্যাদি নিয়ে কমেন্ট করেছ .. ফিল্মের ইমেজ কীভাবে আসে .. তারপর সাউন্ড আসছে, ফিল্মের বিবর্তন দেখলে আমরা তাই দেখি - সেই জায়গা থেকে তুমি, একজন কবি, ফিল্ম সম্পর্কে কমেন্ট করে যাচ্ছে ... সে ফিল্মকে হ্যাঁটা করতে চাইছে না .. ফিল্মকে নিতেও চাইছে না .. অস্বীকার করতেও চাইছে না .. সে একদম চোখ-কান খুলে রেখে বসে আছে ... তোমার কি মনে হয় ?

বারীনদা: আমি বইটার .. লেখার শুরুতে আমার কোন প্রতিপক্ষ ছিল না। প্রথমে আমি নিজের একজন প্রতিভূ তৈরি করলাম – হৃম .. যে আমার হয়ে কথা বলবে। আমাকে সাপোর্ট করবে। তারপরে আমি দেখলাম যে আমি নিজে গিনিপিগ হয়ে গেছি। কীভাবে হয়েছি ? আমি সেই গিনিপিগকে ভালোবাসলাম ... আমি নিজেকে ভালোবাসছি .. নিজেকে রক্ষা করতে চাইছি। কার এগেনস্টে ? রাক্ষসের এগেনস্টে। আমি একটা রাক্ষসের কথাও বলেছি। এই যে হৃম, গিনিপিগ, রাক্ষস .. এই ট্রাঞ্জিশন এবং এ্যান্টি-ট্রাঞ্জিশন এর মধ্যে ঐ ফিল্মিং ব্যাপারটা আসছে। সাদা ফিল্ম রঙীন হয়ে যাচ্ছে .. রঙীন ফিল্ম কালো হয়ে যাচ্ছে, স্ক্রিপ্ট থেকে আনস্ক্রিপ্ট হয়ে যাচ্ছে, নুভেল ভাগের কথা আসছে ... এই রকম ভাবেই আছে। সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। আমি হ্যাপাজার্ডলি সব ওলট পালট করে নিজেকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। আমি গিনিপিগ সেই ল্যাবরেটরি, সেই এডিটিং টেবিলের কাছে চলে যেতে চাইছি বারবার।

অর্জুন: বারীনদা গিনিপিগে দেখিয়েছেন যে এই হচ্ছে ফিল্ম মিডিয়াম সে এই ভাবে কাজ করে এবং তার এই প্লাস পয়েন্ট .. তার এই লিমিটেশন ... এই হচ্ছে পোয়েট্রি মিডিয়াম বা লেখা মাধ্যম বলা ভাল ... সে এই ভাবে কাজ করে তার এই সীমা এবং পরিসীমা। কিন্তু আমার প্রশ্ন হচ্ছে যে গিনিপিগে কি বারীনদা ফিল্ম মাধ্যমের যে কারিগরী জায়গা সেটাকে কাজে লাগালেন ? লাগালেন কি ? সেটা আনলেন কি ? সেটা বিষয় ...

দেবাঞ্জন: এই প্রসঙ্গে আমি স্বপনদার (রায়) একটা লেখার উল্লেখ করতে চাইছি .. স্বপনদা’র ‘গিনিপিগ’ নিয়ে লেখাটি ‘নতুন কবিতা’র নবম বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যায় পুনর্মুদ্রিত হয়েছিল। সেখানে স্বপনদা টেবিল ফর্ম করছেন ... করে বলছেন যে এই কম্পোজিশনটা .. এটা হচ্ছে অমুক শট ... এই কম্পোজিশনটা .. এটা হচ্ছে তমুক .. তুমি কি সত্যিই এ’রকম ভাবে লিখেছিলে ? তার কারণ হচ্ছে কম্পোজিশন ওয়াইজ যখন আমি ‘ধূপশহর’-এর চিত্রনাট্য করছি তখন দেখেছি ওরকম ভাবে ভাবার কিছু সমস্যা রয়েছে ... সমস্যাটা তুমি ইঙ্গিত করেছে .. সত্যিই ছবিতে শব্দ ধরা যায় না। ওভাবে ডিকোড করা যায় না।

বারীনদা: আমি বলে থাকি যে কবিতা হচ্ছে দৃশ্য আর শব্দের যোগে হয় ... ট্রান্সপায়ার করে। দৃশ্যতা এবং শ্রাব্যতা – এই দুই যোগে ট্রান্সপায়ার করে। এটা করতে করতেই আমার মনে হয়েছিল .. লেখাটা শুরু করার সময় আমার কোন সিনেমার কথা মনে হয়নি। দৃশ্যতা .. শ্রাব্যতা .. তার কন্ট্রোল .. তার মেকানিজম .. আলো .. অনালো .. শব্দটা শুনেছিস কখনও .. অনালো .. এই মিলে যে সিচুয়েশনটা তৈরি হতে চায় .. আমরা পারিনা টেবিলে বসে তার রূপ দেওয়া .. একটা কবিতার ভাবনাটা অতিচেতনা দিয়ে প্রসারিত হচ্ছে .. আমরা নতুন কবিতা লিখব, সেটা .. হাউ আই উইল গ্রাস্প দ্যাট .. হাউ আই উইল ব্রিং ডাউন টু ট্রান্সপায়ার দ্যাট ইন ওয়ার্ডস .. এই ব্যাপারটার মধ্যেই আমার ওই সিনেমাটিক ভিশনের ব্যাপারটা আসে .. আসছিল তখন .. তাই ওই সমস্ত ওয়ার্ড-ফোয়ার্ডগুলো এসে গেছিল .. স্বপন ঠিক ধরেছে যে আমি ওই সিনেমাটিক কম্পোজিশনের মধ্য দিয়ে আমি কবিতাটাকেই .. নতুন কবিতার থিওরিটাকেই বলছি গদ্যে .. ঠিক বলেছে।

দেবাঞ্জন: জেনারেলি .. রেন্ডারিং যখন হয় .. মানে ফিল্ম টু পোয়েট্রি বা পোয়েট্রি টু ফিল্ম .. এটার যদি গ্রস কোন একটা স্টাডি করা যায় তাহলে দেখতে পাওয়া যাবে এটা খুব ইজিলি বলে দেওয়া হয় অন্তত বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে দেখতেই পাওয়া যায় – এটা সিনেমাটিক কবিতা .. এখানে অমুক সিনেমাটিক টেকনিকের ব্যবহার হয়েছে । কিন্তু রিভার্সে গিয়ে দ্যাখো .. কবিতা একটা মাধ্যম হিসেবে সিনেমার থেকে অনেক প্রবীণ ... এবার সেখানে দাঁড়িয়ে তুমি যখন এই ডায়ালগ করছ .. মানে তুমি নতুন কবিতা .. তার স্কোপ, তার প্যারাডাইম .. তাকে যখন পোলেমিকসে লিপিবদ্ধ করছ ‘গিনিপিগে’ .. সেখানে মাঝে মাঝে তুমি ফিল্মকে ব্যবহার করছ .. নো ডাউট হয়ত তোমার কিছু জায়গায় মনে হচ্ছে .. স্পেসিফিক্যালি তুমি যখন ন্যুভেল ভাগের কথা বলছ .. ভেরি ইন্টারেস্টিং .. ন্যুভেল ভাগ বিখ্যাত হচ্ছে গোদার, ত্রুফো এবং সেই সূত্রে .. তারা মূলত কাজ করেছেন ফিচার ফিল্মে .. তারা একটা সময় ন্যুভেল ভাগের ডকুমেন্টারি সেকশনেও ছিলেন এবং সেখান থেকে যে কাজটা হয়েছিল .. স্ক্রিপ্ট ছাড়া কাজ করা, ক্যামেরা নিয়ে বেরিয়ে পড়া .. ফলে একধরণের র‍্যান্ডাম বা যেখানে প্রি-অকুপেশন নেই .. খুব অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে তুমি যখন নতুন কবিতার কথা বলছ বাংলা ধারা কবিতার রেসপেক্টে তুমি অলমোস্ট সেই জায়গায় রিচ করার চেষ্টা করছ বা রিচ করার কথা বলছ। এত অবধি আমি একদমই একমত স্বপনদা'র সাথে। কিন্তু যেখানটায় আমার স্বপনদা'র বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে .. এইভাবে কি সত্যিই ভাবা যায় ? স্বপনদা'র বক্তব্যের রেসপেক্টে নয়, বরং শব্দে আমি যখন ফিল্ম টেকনিককে ব্যবহার করতে যাব তার রেসপেক্টে প্রশ্ন যে এইভাবে ক্লোজ শট নিচ্ছি .. এইভাবে কম্পোজিশন তৈরি করছি .. এই ভাবে মন্তাজ তৈরি করছি .. তোমার কি মনে হয় .. মানে গিনিপিগ বা গিনিপিগ থেকে একটু সরে এসে শব্দের কারবারী হিসেবে তোমাকে আমার জিজ্ঞাসা – এটা কি করা সম্ভব হয় ?

বারীনদা: আমি ধারা কবিতার আশেপাশে বিটিং এ্যারাউন্ড দ্য বুশ কোনদিনও করিনি। এই বইয়ের কোন লেখাতেও তা নেই। যদি প্রত্যেকটা চ্যাপ্টার আলাদা আলাদা লেখা বলে ভাবা যায় .. ভাবা যেতেই পারে .. তার ধারে কাছেও নেই। ধারাকবিতার কথাটা তুই কেন বললি আমি জানি না। আমরা চিরকাল সেটার থেকে দূরে থাকতে চেয়েছি।

দেবাঞ্জন: আমি সেই কথাই বলেছি .. ধারা কবিতার থেকে ডিফারেন্স করতে চেয়েছ .. তার প্রসেসটা ..

বারীনদা: আমি লেখার সময় মেইনলি .. আমার নতুন কবিতা এবং অতিচেতনা থেক নতুন কবিতায় কীভাবে ট্রান্সপায়ার হবে সেই ব্যাপারটাকে জট ডাউন করেছি .. চ্যাপ্টার বাই চ্যাপ্টার .. সেই ট্র্যাঞ্জিশনের মধ্যে সিনেমাটা এসেছে। আমি সিনেমা নিয়ে স্পেশ্যালি কিছু ভাবিনি। সিনেমা যখন এসেছে তখন সিনেমার ব্যাপারগুলো, টেকনিকগুলো .. সমস্ত গুলো যাচাই করতে করতে এসেছে। তার মধ্যে নতুন কবিতার কনসেপশনটা .. হাউ ইট ফিটস .. সেই সমস্ত টেস্ট করতে করতে এসেছে।