ফিরে পড়াঃ কবিতা

সব্যসাচী সান্যালের ‘হরিপদগিরি’ থেকে

নীলাব্জ চক্রবর্তী

হিউমার আর গম্ভীর কবিতা আর আদ্যন্ত পরীক্ষাভাবনা... স্টাইল আর ফ্যাশন নিয়ে কিছু বলার অনেক উপরে... ছুঁয়ে ছুঁয়ে সিগনেচার ছুঁয়ে ছুঁয়ে অনন্য কবিতাবই এই হরিপদগিরি। তখনো ‘পরিবিষয়’ তখনো ‘পরিবিষয়ী কবিতা’... না। সে তো কৌরব-১১১ সে তো ২০১১-র জানুয়ারি। তারও তিন বছর আগে ২০০৮-এর জানুয়ারিতে কৌরব প্রকাশনী প্রকাশ করে সব্যসাচী সান্যালের হরিপদগিরি। উল্লেখ করা যেতে পারে, প্রচ্ছদে ছাপা চায়ের খুরির ছাপ আর চায়ের ফোঁটা ফোঁটা দাগ দেখে কলকাতা বইমেলায় কেউ কেউ নাকি তাঁদের সংগ্রহ করা কপিটি বদলে দিতে অনুরোধ করেছিলেন...

না দিদিমণিরা না মশাইরা... বদল হবেনা... এই বই বা এই বইয়ের কবিতা... কিছুই আর কখনো বদল করা যাবেনা... ওই ছাপছোপ দাগরাজি যেমন চিরমুদ্রিত প্রচ্ছদে, তেমনি পাঠিকাপাঠকের পঠনস্মৃতির মধ্যে জ্বলজ্বল করেই থেকে যায় এই হরিপদগিরি...

তার ভাষার তার ভাবনার তার বহুস্তরীয় কাঠামোবিন্যাসের প্রায় কিছুই বোধহয় বোঝানো যাবে না এইসব কথায়। বরং আসুন, কিছু কবিতা পড়া যাক হরিপদগিরি থেকে... এবারের ফিরে পড়া কবিতা বিভাগে...



গুডবাই মিলি; এ সাইলেন্ট মুভি

এই বিকেল ভাঙায়
সারসের সরাসরি থাক
পড়ন্ত লিচুর বাগানে খুনখারাপের আলো
বিকল শ্রেণীর হাড়ে বোবা সিনেমারা
আমার নাদেখা জনকরোড নাদেখা সীসাম...

যবনিকা এক মুসলমানের মেয়ে
যার মুখ নিপুণ বিধুর
কেয়াঝোপে হঠাৎ ফুটেছে কোন
ধীর ধ্রুপদ-ব্যতীত

হঠাৎ-এর কাছে ভালো থাকি
অচানক, জানি তার দ্রুতি
ব্যারিটোনে নেই
মিনার টপকে যাওয়া লাফ

জাম্প-কাট বোবা সিনেমারা –

চতুর্দশীর চাঁদে কথা থাকে
স্বগত কুয়াশা ট্র্যাজিক সানাই
চাঁদ নয় কথা নয়
বিকেল
পলকে
ভেঙে যাবে
বোবা সিনেমায়।


হরিণের আপদ বা আপদের হরিণ

পাখি সারাই হয় যে ডালে
সেই হরিণের ডালপালা দেখে
মোকাসিনে জড়াই যাহাকে
তার নাম নিরা-পদ
(ডালপালা গাছেরই তো থাকে
অপাহিজ, তাই ভালো লোক, খায়না আমাকে)

হরিণীর কাছে যাব যাব ক’রে
যাইনা কে জানে নিরাপদ কিনা!
ডালপালা নাইতো তাহার!
জানে কে না বাঘেরও তো ডাল থাকেনা!
বরং বাবারে
ঢুকে পড়ি সুপার বাজারে

রিন টিন টিন
দোকানি দোকানি আমাকে একটা
চাপা-মাছ দিন
জলের মাটিতে শুয়ে দু’চোখের
দু’দুটোই যার নীল সিলিং-এর দিকে
(এমনকি বরফে বসেও)
সেই মাছ খেয়েছে আমাকে
আর আমার হরিণবোধ
মোকাসিনে জড়ানো যা ছিল সেই তো আ-পদ!

আপদের কি কি পদ হ’ল?
সুক্তো সর্ষে ভাপা পটরোস্ট
ডিজার্ট নিয়েও প্রায় সাত দিন
দোকানি দোকানি একি ক্রিয়াপদ দিয়েছ!
তাও কলাপাতা মুড়ে
আরে, এটার তো ডালাপালা নেই!
এটা কি হরিণ!


ভোর ছ’টার সেমিনার

টিভি নেই, ঝিরঝির আছে
আমি বালিশের তলায় পিস্তল
আমি চেপে কত আভাষে ডাকছি

এসোহে অমল ডাক
বসোহে অমল কাক
এই তনু ধবলেরও চাইতে অমল

এই অমল পিস্তল

বিছানা বড়ই আজ সারিগান
খোলসের ভেতর খোলস
খোলসের ভেতর বালামচি ঘোড়া
হলুদ কোরক যার
খোঁড়া চিত্ররূপে শানায় না বলে দারুণ গর্হিত

আমি নিতান্ত খাকি দারোয়ান
গায়ে নোনা কোলাবা চাদর
সকালের কাপে পিস্তল ডুবিয়ে চিনি গুলে গুলে
আজ রোব্বার আজ সকাল ছ’টার সেমিনার।


নোটন মাহাতোর কবিতা

আমিতো একলা থাকি
দু’মানুষ জলের গভীরে
আমার প্রেমের সাথে আমার প্রেমিকা থাকে
দুই মানুষের জলের ভেতর
বৃষ্টিতো নয়
বৃষ্টিদিনের কথা ভালবাসি।

বরং বরং ভাবি
বরঙেই ছবি টবি আঁকেন অবন
আমি সেই ছবির নৌকা
যার গায়ে মাছেদের কথা ঠুকরায়
দু’মানুষ জলের গভীরে
লেবু গাছে কুঁড়ি কুঁড়ি থোকা
লেবু গাছে ছাড়া ছাড়া কাঁটা

দু’মানুষ জলের উঠোনে
কাঁটা নয় কাঁটার ফিকির হয়ে থাকি
দু’মানুষ জলের ওপিঠে
কোন লেবু গাছ আমি নয়
আমার গল্প ভালবাসে।


ডাকপিয়ন

ডাকো তো কেমন তুমি সুডাকপিওন
বার্চ-এর বন থেকে কেমন চিঠিরা উড়ে আসে
চিঠি ও চিন্তা শুকাতে এই দু-খুঁটির তারে ঝুলে পড়া
আহতেরই ভোর আসে আগে রাত্রিও

রাস্তা ফিরিয়ে দিচ্ছি
ভোর খুলে পরীরা দিয়েছে তাও
মানুষের ঘুম থেকে ঝরে যায় নীল গ্রামাফোন
আমার স্বপ্নের ভেতর
গভীরের দারুণ অভাব সেঁধোতে পারিনা
আরে, রাস্তাই তো ফিরিয়ে দিয়েছি
ঘর তো ফেরাইনি!

ঘর’কে ডাকলে একটা গলিপথ মোচড়াতে মোচড়াতে প্যাঁচ খুলে আসে দেখা পড়ে খোয়া ইঁটে বৃষ্টি থেকে শ্যাওলা ফোঁটার বুকে হাঁটা পিছল জনন। সুডাকপিওন, ওভারকোটের কলার খেয়ে ফেললে, মুখের কন্ট্যুর আমি তোমাকে দেখেছি, পার্সেল ফুঁড়ে ছুরিদের ওঁৎ, ঘর’কে ডাকতে ডাকতে অন্ত্র পাকস্থলী ক্ষিধেয় সাপটে নেয় পরিচয়-সুদ্ধ সরু ফলা ছুরি। হত্যার চেয়ে মৌনতা কে? কোন সুডাকপিওন?


জ্বোরো লেখা

আলোকে ঋদ্ধ করে হেঁটে
যাওয়া পাঠ্য টেবিল আমি
তার দেশে ছুতোরের অনাহুত ছেনি

অনাস্বাদের ভেতরে গড়ালো যে
তার রাত চোলাই দ্বিধার গায়ে
বর্ণহীন এমন-কী অন্ধকা হীন

ছোট ছোট চলে
যাওয়া নিয়ে আলো-পল্টন
নেভা নেভা ফুলের গঠনে
আমিও তো নিদ্রাহীনতা আঁকি
হে ধূমজ্বর
হে আমার ফারেনহাইট


খাবার টেবিল

চিরকালীন ব’লে একটা বাড়ি হয় আর
একজন খড়খড়ি নিভিয়ে থুতনির
স্থাপত্য তালুতে বসায়
শহরের লণ্ঠনেরা ফিরে গেছে আমার
মগজের বাঁ-পাশের কাঠে ঘুরে
যায় ঈশ্বরের হাত
এক ছুতোরের হাত
বাইরে বোমা পড়ার সময়কার
চামড়া রোমকূপ

খাবার টেবিলে নিরাপত্তার ডৌল-টুকু
আম-দানি বাকি আম
মানুষের জিভ আর ফর্ক বাদে
যেটুকু মাছের চোখে জালস্মৃতি
অবিশ্বাস স্ন্যাপ। ফ্র ীজ।।

এভাবে বৌলে সাজানো থাকবো ভাবিনি

সকালে মিক্সির গোঙানি ঘুরিয়ে আনবে
আমার লিচুর রস
পৃথিবীর নুয়ে আসা বাতাবীবাগান ডালে
শেভিং ফোম ফুঁড়ে ঘুমফাটা মুখ

হলুদ নেমে আসছে ওড়না ল্যাম্প পোস্ট
থেকে একটা শাটার ডাকলো তো সমস্ত
শাটারের দম ফেলা
ভাবো এক খোকা জড়ুলের কথা
ভাবো কার নাম ‘তিমির’ হ’তে পারতো
কেটেকুটে সুস্থতা ফেরানো যার খাবার টেবিলে।


বসন্ত

তিনি বললেন
যে কোন ইমোশানের স্বাদ নোনতা।
আমি ভাবছি – এই ডায়াবেটিসের যুগে
স্বমেহনে কত মধু

ছেঁড়া ছেঁড়া সংলাপের মধ্যে এ.টি.এম
বুড়ো পেরুভিয়ানের অ্যাকর্ডিয়ান
আমি ভাবছি – কবিতা মানে তো
খাট
এর পায়া
র গর্ত
র ঘুণপোকা
র বামেতর অণ্ডকোষ
এর ৩৫৬-তম শুক্রাণু
র বাম গাল
এর ব্রণটি

এর পর বসন্ত হয়

মানে, খুব চকিত লাফে
সাইকেলের সীট ফাঁকা ছিলো
এখন সেখানে সবুজ ব্যাঙ
মানে, একদম অপূর্বপরিকল্পিত
হাসপাতালের বার্চ
চমকসবুজ...

আমি খুব সফিস্টিকেটেড
ওয়ালেট বের করি
গুণে গুণে ৫৬ ক্রোনার
ঝিরি ঝিরি গাজর
আর খুব দেশি মতে
বাম হাতে ছুরি
আবেগপ্রবণ স্টেকে মরিচ
ঢালতে ঢালতে দেখি
বসন্ত ফের
ঢুকে গেছে
খাপে।


ডাকবাক্সের গানে 007

দুপুরের পায়ে গণিতের এক পাটি
ছায়াতে ঠেসিয়ে ঝাঁঝাঁ সাইকেল
ক্রীং-বেল চ’লে গেছে কাচা
ঘুম শুকাতে শুকাতে আইসক্রীমের গাড়ি

আবার আসিবো ফিরে
টোপাজ ব্লেডের সুরে
এলাচের ক্ষেত
হকারের ঘামে জারানো
টি-শার্ট ফাটিয়ে
নেপথ্যে একবার; ঢ্যানট্যানা... ট্যানা... ট্যা না...

আজ ডাকবাক্সের শামুকের
খোলা কাঁদলোনা
M.Sc ছেলেদের ভিজে স্ক্যালপেল
হেঁটে যায় লম্বা জুলাই
নীলখাম মেখে গাঢ়তর পিস্তল
খুনখামারের প্রভা
চকিত স্তনের বাঁকে জীপ ফসকালে
কুয়াশা নামবো প্রভু

মাধবীলতার গ্যারোটি-তে গান
পেতে দিচ্ছে লেটারবক্স
বন্দীশ হাতে ফিরে যায় 007


কোডাইকানাল-এ ৪ দিন

আমি কোনোদিন কোডাইকানাল যাইনি

ফলে কোডাইকানাল একটি রৌদ্রালো দেশ
বস্তুত একটি বালুচরী দেশ
আমি সেই বালুর উপর পাটি পেতে
হেমিংওয়ের জীবনী পড়তে পড়তে
পিস্তলে হাত বুলাই
আর, ঠিক পিছনের ঝাউবন হেমিংওয়ের
জীবনী পড়তে পড়তে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।

আমি কোনোদিন কোডাইকানাল যাইনি

ফলে কোডাইকানাল একটি বর্ফিলা গ্রাম
সেখানে খচ্চরের লোম – রোম বলে পরিচিত
আমি এক চামড়ার কায়াকে ভ্রূণপোজে
হেমিংওয়ের জীবনী পড়তে পড়তে
কশের ফাটলে নুনপিট খুঁজি
আর ঠিক পিছনের ভল্লুকগুলি হেমিংওয়ের
জীবনী পড়তে পড়তে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।

আমি কোনোদিন কোডাইকানাল যাইনি

ফলে কোডাইকানাল একটি রুদ্ধশ্বাস দেশ
সেখানে হেমিংওয়ের জীবনী খুলতে না খুলতে
ভোরের সূর্য পশ্চিমে ঢলে
আর, এই গতির ঘোরে রুদ্ধশ্বাস,
পিস্তল বা প্রোভোকেশান ছাড়াই
আমি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাই।

আমি কোনোদিন কোডাইকানাল যাইনি
(যেহেতু এখন নিশ্চিহ্ন আমি শূন্যস্থান আপনার দখলে)

আমি কোনোদিন কোডাইকানাল যাইনি
ফলে, আমি যেখানেই যাই কোডাইকানাল
সেখানে গিয়েছে


উৎপলে দু’ই

১।
কার্পাস বাগানে ঈশ্বরপ্রদত্ত গাধা,
কোন বাড়িকেই আর বসবাসযোগ্য মনে হচ্ছেনা, মরিয়ম

যে সব পাখির ডাক রোজ শুনি তারা
সবই খুফিয়া বিহঙ্গ
বনবিভাগের আলো এই এতোটা নিবিড় খেয়ে নিল
স্নিগ্ধ হিমের তাঁতে বসবাসযোগ্য আর কোন গান
বসতে চাইছে না

ঘোর তদন্তের মরশুম
আশেপাশে সব ফলের দোকানে সাদা-পোষাকের ফুল
আমি খুব ভয়ে চারদিকে ঘুমিয়ে পড়ছি তত্ত্ব না জেনে
কাঠের টেবিল আদতে ঘুমন্ত গাছ – এ কথা না জেনে
টর্চের আলো ফিরি করা যে কোন যুবকের হাঁক থেকে পালিয়ে যাচ্ছি

আমার চাউনিটুকু শাদা পড়ে আছে কাপাসবাগানে।

২।
আমি বলছি – মাফ করবেন, এই বেলুনটা কি আপনার?
আমি বলছি – মাফ করবেন, এই চাঁদটা কি আপনার?
আমি রাস্তায় কুড়িয়ে পাচ্ছি এই সব অবিন্যস্ত স্তন্যাধার
আমি বলছি – মাফ করবেন, এই পৃথিবীটা কি আপনার?

হাত ক্রমে অসমর্থ হয়ে উঠছে
আমি কিছু ধরতে পারছিনা
এত ইঙ্গিত আর এত ঝানু ও গম্ভীর হয়ে এল কলের গানেরা

ফাঁকা তেষট্টির মাঠে
নিজের মুখের পাশে হাঁটু মুড়ে
বলে উঠছি
মাফ করবেন, এই দেহটা কি আপনার?

খুব সম্ভবত একটি প্রেমের কবিতা

আমাকে কে ডিফাইন করে?
আমার অবস্থান নাকি
তোমার ও আমার অবস্থানগত কনফ্লিক্টগুলি

আমার চশমার ডাঁটি বেয়ে রোদ
তোমার রুমালে চাঁদের মহড়া
আমি আসিবো না

আসিবোনা ফাগুন গেলে
মানে আসবো না, আসিবো না
এখানে ফাগুন ছাড়া আমার অবস্থান
ভিন্ন-অক্ষাংশে ঘাসে ঘাসে হেলানো ভায়োলেট

তুমি তো ওহো
ফাগুন ফুরায় যদি তবে থাকো
পুরোনো বাংলা গানে ডাকো

আমি তো হলাম না
মানে, খুব ডেফিনিট হলাম না
কনফ্লিক্টের দারুণ অভাবে

খুব ভাসা ভাসা দৃশ্যত অস্পষ্ট শ্রবণে
প্রকট এই আমলকি বনে

তুমিও হলে না।