ওপারের জানালা

শ্রীমদ্ভাগবদ্গীতার বর্ণসঙ্কর তত্ত্ব, অনার কিলিং বা লাভ জিহাদ: পিতৃতন্ত্র নামক মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ?

অদিতি ফাল্গুনী

দার্শনিকতার মোড়কে সমাজের স্থিতাবস্থা বা বর্ণাশ্রম টিঁকিয়ে রাখার গ্রন্থ হিসেবে গীতাকে যেমন অনেকে দেখে থাকেন (স্বধর্মে মৃত্যুও ভাল এবং পরধর্ম ভয়াবহ অর্থে) আবার নিষ্কাম কর্মের দর্শন আধুনিক মানুষের রক্ষাকবচ কিনা, নানা নেতির মাঝে মানুষকে তা’ স্থির থাকতে দেয় কিনা বা ‘স্বধর্ম’ অর্থ কি বংশবৃত্তি নাকি ব্যক্তির যে কাজ করতে সবচেয়ে ভাল লাগে (যেমন, চিত্রশিল্পীর ছবি আঁকা বা গায়িকার গান গাওয়া এবং সেসব কাজ ছেড়ে হিসাব বিজ্ঞান বা ডাক্তারি পড়া শেষপর্যন্ত ক্ষতি করে কিনা) ইত্যাদি ইত্যাদি নানা বিতর্কও আছে। একজন নারী হিসেবে আমাকে ব্যক্তিগত ভাবে সবচেয়ে অবাক করে এবং বারবারই অবাক করে প্রথম অধ্যায় বা ‘অর্জুনবিষাদযোগ’-এর এই শ্লোকটি:

‘অধর্মাভিবাৎ কৃষ্ণ প্রদুষ্যন্তি কুলস্ত্রিয়:।

স্ত্রীষু দুষ্টাসু বার্ষ্ণেয় জায়তে বর্ণসঙ্কর: ।’ (শ্লোক নং ৪০)।

শ্লোকটির অর্থ ‘হে কৃষ্ণ, অধর্মের তারা অভিভূত হইলে কুললক্ষীগণ দুষ্টা হয়। হে বার্ষ্ণেয়, কুলস্ত্রীগণ দুষ্টা হইলে বর্ণসঙ্কর হয়।’

ম্যাক্সমুলার প্রচারিত ভারত উপমহাদেশে সেন্ট্রাল এশিয়া থেকে আর্যদের আগমন তত্ত্বকে যদি সত্যিই ধরে নিই (এই তত্ত্ব নিয়েও প্রচুর বিতর্ক ও সন্দেহ দেখা দিচ্ছে; ম্যাক্সমুলার মূলত: ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা-গোষ্ঠিগুলোর ভেতরকার ভাষাগত সাদৃশ্যের ভিত্তিতে তাঁর তত্ত্ব খাড়া করেছিলেন), তাহলে গীতার এই শ্লোক কতটা হাস্যকর আর নারী-বিদ্বেষী তা’ বুঝতে সমস্যা হয় না! আমরা কি এখানে ‘বর্ণসঙ্কর’টা আজকের হিসেবে বংশবৃত্তিও নয়, পদবি বা বংশনামের ক্ষেত্রে ধরে নেব? নাকি মহাভারতের সেই সময়ের (যুদ্ধটি পুরো কাল্পনিক হোক বা তার কিছু বাস্তব ভিত্তি থাক) নিরিখে এখানে ‘বর্ণসঙ্কর’ বলতে বহিরাগত শ্বেতকায় আর্য জাতি আর এখানকার অনার্য জাতির মিশ্রণের শিশুদের ধরে নেব? শ্রীকৃষ্ণের মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে কেন? শুদ্রের ঘরেও কি জন্ম নিচ্ছে ফর্সা রং আর খাড়া নাকের শিশু আর উচ্চ বর্ণের ঘরেও কি জন্ম নিচ্ছে কালো রঙ বা বোঁচা নাকের শিশু? অথবা সাদা-কালো ভেদ ঘুচে এক বৃহৎ জাতি জন্ম নিচ্ছে? সবার রং তাম্র হয়ে গেলে বর্ণভেদ রাখা যাবে না আরো যদি একলব্যের মত যোগ্যরা দেখা দিতে থাকে অনেক সংখ্যায়? মিশ্রন এড়ানো যাচ্ছে না? ‘মহাভারত’-এর হাজার হাজার বছর পর রাহুল সাংকৃত্যায়নের ‘ভোলগা থেকে গঙ্গা’র শেষ অধ্যায়ে এক দলিত তবে বৈমানিক যুবক অপর এক ব্রাক্ষণ ভদ্রলোককে বলছেন, ‘ওঝা জি- দেখুন- আপনার নাক বোঁচা আর গায়ের রঙ কালো যদিও আপনি ব্রাক্ষণ। আর আমার গায়ের রঙ পাকা গমের মত আর নাক খাড়া। এর অর্থ আমার দেহে আর্য রক্তের ভাগ আপনার চেয়ে বেশি। এর অর্থ আপনার পূর্বপুরুষের হাজার বিধি-বিধান সত্ত্বেও ভোলগা থেকে গঙ্গার রক্তের ধারা মিলে-মিশে আজ একাকার হয়ে গেছে। বর্ণের সংমিশ্রন আপনারা ঠেকাতে পারেন নি।’

তা’ বর্ণের মিশ্রন ত’ ঠেকানো যায়ই নি। কিন্ত সে দায় কি আর্য নারীদের ছিল না পুরুষদের? স্থানীয় নারীদের আক্রমন করা বিজাতীয় পুরুষের ফলেই কি দেখা দেয় নি বর্ণ সংমিশ্রন? আজো যেমন বাড়ির কাজের মেয়ের সাথে সম্পর্কটি বাড়ির মালিক পুরুষ বা তার ছেলের সাথেই হয়। উচ্চবিত্ত শ্রেনীর মহিলা নি¤œশ্রেনীর পুরষের সাথে কিন্ত হয় না বা হতে চায় না। কিন্ত ধর্ম তথা পুরুষতন্ত্রের প্রতিভু সেকথা স্বীকার করবেন কেন? কাজেই ‘উদোর পি-ি বুধোর ঘাড়ে’ চাপিয়ে নারদ সংহিতায় ‘বর্ণসঙ্কর’-এর সংজ্ঞা দেওয়া হচ্ছে:

‘আনুলোমেন বর্ণানাং যৎ জন্ম স বিধি: স্মৃত:

প্রাতিলোমেন যৎ জন্ম স জ্ঞেয়ো বর্ণসঙ্কর: ।’ নারদসংহিতা, ১২/১০২।

- সকল বর্ণের অনুলোম (অধমবর্ণের স্ত্রী ও উত্তমবর্ণের পুরুষ)-ক্রমে যে জন্ম হয়, তাহা বৈধ এবং প্রতিলোম (উত্তমবর্ণের স্ত্রী ও অধমবর্ণের পুরুষ)-ক্রমে যে জন্ম হয়, তাহাকে বর্ণসঙ্কর বলে।

এর অর্থ উচ্চবর্ণের (পড়–ন বহিরাগত) পুরুষ নি¤œবর্ণের (এদেশীয়, স্থানীয়) নারীর সন্তান বৈধ হবে এবং উল্টোটা হলে সেটা ‘বর্ণসঙ্কর।’ উপনিবেশের ধর্মই তাই। স্পেনীশ কনকিস্তাদরদের হাতে রেড ইন্ডিয়ান নারীর নিপীড়নও নানা কায়দায় এভাবেই বৈধ করা হয়েছে। আর ‘অভিজাত’ শ্রেনীর নারীর বিপথগামিনী হওয়া? ওরে বাবা! মল্লিকা সেনগুপ্তের ‘সীতায়নে’ শ্বেতাঙ্গিনী সীতাকে রাবনের হরণ, সীতার পুনরুদ্ধার, সুপর্নকার নাক-কান কাটা, শুদ্রক হত্যা প্রভৃতির যথাসম্ভব একটি সমাজ-তাত্ত্বিক তথা নৃ-তাত্ত্বিক ব্যখ্যা রয়েছে। কিছু শ্বেতাঙ্গ নারী কি অপহৃত হয়েছে আসলে স্থানীয় পুরুষের হাতে? ‘রামায়ণ’ তার একটা আভাস ত’ অবশ্যই দেয়!

যাহোক, কালে কালে ভারতে থিতু হলো বটে আর্যরা- কার্ল মার্ক্সের ভাষায় ‘হিন্দু ভুত’ কোনদিনই কোন বহিরাগত শক্তির সাথে যুদ্ধে জয়ী হয় নি। কাজেই বিন-কাশিমের সিন্ধু জয়ের পর থেকে এদেশে যখন মুসলিম শক্তি দেখা দিলো, একইভাবে এদেশীয় নারীর বিয়ে হতে থাকলো আরব-তুরষ্ক-ইয়েমেন-পারস ্য থেকে আসা পুরুষদের সাথে। ভিন দেশ থেকে অল্প সংখ্যায় যে যোদ্ধারা এসে এই শস্যশ্যামল উপমহাদেশে ঠাঁই গেড়েছে, তারা অত নারী পাবেই বা কই যদি স্থানীয় নারী গ্রহন না করে? এখন কিভাবে বিয়ে হবে ‘হিন্দু’ নারী ও বহিরাগত ‘মুসলিম’ পুরুষের? উপায় তখনো পর্যন্ত একটাই: ধর্মান্তর। কারণ ‘হিন্দু ধর্মে’ (যদিও হিন্দু শব্দটাই বহিরাগতদের কাছ থেকে ধার করা) ‘ধর্মান্তর’ ছিলই না।

এখানে একটা কথা বলে রাখা ভাল। মুসলিম আইনে তথা শরিয়ায় আন্ত:সম্প্রদায় বিয়ের ব্যবস্থা কি? আইনের ছাত্রী হিসেবে মুসলিম আইন পড়ার সময় আন্ত:সম্প্রদায় বিয়ের ক্ষেত্রে তিন প্রকৃতির বিয়ের কথা জানা যায়। প্রথমত: মুসলিম নারীর বিয়ে কোন অ-মুসলিম পুরুষের সাথে একেবারেই নিষিদ্ধ। মুসলিম নারীকে অ-মুসলিম পুরুষ বিয়ে করতে হলে অ-মুসলিম পুরুষকে ধর্মান্তরিত হতেই হবে। তবে মুসলিম পুরুষের জন্য তিন প্রকৃতির বিয়ে আছে:

১. মুসলিম পুরুষ-মুসলিম নারী বিয়ে: এই বিয়ে শতভাগ বৈধ। সন্তানেরা সম্পত্তির আইনগত উত্তরাধিকারী।

২. মুসলিম পুরুষ-কিতাবিয়া নারী বিয়ে: ‘কিতাবিয়া’ নারী অর্থ অ-মুসলিম হলেও ক্রিশ্চিয়ান বা ইহুদিদের ভেতর থেকেও যেহেতু ‘নবী’ এসেছে (যেমন, মোজেস ইসলাম ধর্মে মুসা নবী (রা:) বা যিশু খ্রিষ্ট ইসলাম ধর্মে হযরত ইসা (রা:) এবং তৌরাত-ইঞ্জিল (বাইবেল)-কোরানকে একটা নির্দিষ্ট সিরিজ গ্রন্থের ‘কিতাব’ (বই) হিসেবে মনে করা হয়, কাজেই মুসলিম পুরুষ-কিতাবিয়া নারীর বিয়ে ‘অনিয়মিত (ইরেগ্যুলার’ বিয়ে হলেও অবৈধ নয়। সন্তানেরা বৈধ আর পিতার সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার দোদুল্যমান। পিতা ইচ্ছা হলে দেবেন আর ইচ্ছা না হলে দেবেন না। তবে ধর্মান্তরিতা না হয়েও একজন কিতাবিয়া নারী এক মুসলিম পুরুষকে বিয়ে করতে পারেন।

৩. মুসলিম পুরুষ- প্রতিমা পূজারী/অগ্নি উপাসিকা বিয়ে: কিন্ত মুসলিম পুরুষের সাথে প্রতিমা পূজারী (আইডলোট্রেস) বা অগ্নি পূজারী (ফায়ার ওয়্যারশিপার) নারীর বিয়ে? এই বিয়ে অবৈধ ও সন্তানেরাও অবৈধ যদি না নারীটি ধর্মান্তরিত হয়। সন্তানের উত্তরাধিকার পাওয়া ত’ অনেক পরের কথা।

হ্যাঁ, শরিয়া এটাই বলে। কারণ পিতৃতন্ত্র। পিতৃতন্ত্রে নারীর যৌনতা ও পুনরুৎপাদনের উপর পুরুষের অধিকার বা নিয়ন্ত্রণ থাকা অপরিহার্য। কারণ নারীর মাধ্যমেই সন্তান লাভ হয়, বংশ বাড়ে, আগামীদিনের শ্রমিক থেকে সৈনিক সবই পাওয়া যায়। কিন্ত এই নারী যদি যায় ‘শত্রু’র হাতে? যদি যায় ‘শুদ্র’ বা ‘কাফের (অবিশ্বাসী)’-র হাতে? তবে ত’ নারীটি এবং নারীর মাধ্যমে পাওয়া সম্ভব সন্তানেরাও হাতছাড়া হয়ে যাবে। সেটা কি পিতৃতন্ত্র অত সহজে মানতে প্রস্তত? প্র¯ত্তত যে নয় সেটা শ্বেতাঙ্গ নারীবাদী কেইট মিলেটও আক্ষেপ করে, তির্যক পরিহাসে লেখেন শ্বেতাঙ্গ পুুরুষ সম্পর্কে তাঁর ‘সেক্স্যুয়াল পলিটিক্স’ গ্রন্থে (What lingers of supernatural authority, the Deity, "His" ministry, together with ..... racism's older protective attitudes toward (white) women also begin to give way. ... is brought on to master or humiliate the white man's own insubordinate mate: page 39, Sexual Politics);

একথা ত’ অস্বীকার করা যাবে না যে গড়ে একজন আরবীয় বা এমনকি ভারতীয় মেয়েদের নাগরিক, মধ্যবিত্ত অংশে অনেক প্রাগ্রসরতার পরও অবশ্যই একজন আরবীয় ত’ বটেই একজন ভারতীয় নারীর থেকেও একজন পশ্চিম ইউরোপীয় বা মার্কিনী শ্বেতাঙ্গ নারী শিক্ষা-চাকরি-সঙ্গী বাছাই-ভ্রমণ সহ নানা বিষয়েই অনেক অনেক বেশি স্বাধীন। রেনেসাঁর পর থেকেই পশ্চিমে নারী মুক্তির বিষয়টি একটু একটু করে আলোচিত হতে শুরু করে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর থেকে শ্বেতাঙ্গ নারীর উপর শ্বেতাঙ্গ পিতৃতন্ত্রের নানা বিধি-নিষেধ অনেকই কমে আসে। কমে আসতে বাধ্য হয়। সেটা পশ্চিমা বুর্জোয়া পুঁজিবাদী অর্থনীতি ও আনুষঙ্গিক গণতান্ত্রিক (সংসদীয় বা রাষ্ট্রপতি শাসিত যেটাই হোক) রাজনৈতিক শাসন ব্যবস্থার আবশ্যিক শর্তাবলী মানার জন্য যে কারণেই হোক না কেন। ফলে একজন শ্বেতাঙ্গ নারী কালো পুরুষ বিয়ে করলে শ্বেতকায় পুরুষের ভাল না লাগলেও দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করতে হয়। কখনো কখনো সবক্ষেত্রে ‘সমান’ শ্বেতাঙ্গ নারীর হাত থেকে ‘উদ্ধার’ পেতে ব্যাঙ্ককের নাইট ক্লাবে ‘থাই’ নারীর ‘শরণ’ নেওয়া শ্বেতকায় পুরুষের কথাও লিখেছেন জার্মান ইকো-ফেমিনিস্ট মারিয়া মাইস ‘ইকো-ফেমিনিজম’ গ্রন্থে (মারিয়া মাইস ও বন্দনা শিবা রচিত...বইটা বাসায়...হুবহু পৃষ্ঠা থেকে উদ্ধৃতি দিতে পারছি না)। কারণ একইসাথে ‘নারী’ ও ‘অশ্বেতকায়’-এর ‘আদারনেস’ বা ‘অপরতা’ যুক্ত হলে শ্বেতকায় পুরুষের পৌরুষের ‘আধিপত্য’ খুব ভাল ভাবে প্রতিষ্ঠা করা যায়। সম্ভবত: প্রসঙ্গ থেকে একটু সরে গেলাম। মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসি।

এখন পিতৃতন্ত্রের স্বরূপই এই। সভ্যতার শুরু থেকেই এক গোত্রের পুরুষ অন্য গোত্রের নারীকে জয় করে আনা ও গোত্রের সদস্য বৃদ্ধি ও নিজের ‘নারী’র অন্য গোত্রের হাতে হরণ হওয়া বা স্বেচ্ছায় পালিয়ে যাওয়া গোত্রের সম্মানের প্রতি বড় আঘাত হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। সত্যি বলতে বাংলাদেশে আমরা ভারতে সঙ্ঘ পরিবারের নানা কার্যকলাপ সম্পর্কে কিছু কিছু জানলেও খুব বিস্তারিত কিছু জানি না। তবে গত কয়েকদিন ফেসবুক থেকে বুঝতে পারলাম সম্ভবত: ভারতে বিজেপি নেতৃত্ব হিন্দু মেয়েদের হাতে মোবাইল দিতেও নিষেধ করছে। এটা হয়ে থাকলে সত্যি ভয়াবহ বিষয়। কিšত্ত পৃথিবীর ইতিহাসে পিতৃতন্ত্রের বিকাশ যদি আমরা দেখি, তবে খুব অস্বাভাবিকও নয়। যেমন পাকিস্থানে ‘অনার কিলিং’ বিষয়টা খুবই প্রচলিত। ভারতেও আছে। পাকিস্থানে অনার কিলিংয়ের সংখ্যা বেশি বলে সেদেশের প্রেক্ষিত আলাপ করে ভারতীয় প্রেক্ষিতে আসছি। তবে সারা বিশ্বে প্রতি বছর সঙ্ঘটিত অনার কিলিংয়ের ৯১ শতাংশ মুসলিম সম্প্রদায়ের পুরুষের হাতেই সঙ্ঘটিত হয় (http://www.jihadwatch.org/…/islamic-honor-killing-in-uk-m us…))

পাকিস্থানে কোন পরিবারের মেয়ে যদি এমনকি পরিবারের পছন্দের একটি ছেলেকেই বিয়ে না করে ধরা যাক নিজের পছন্দের কোন ‘মুসলিম’ ছেলেকেও বিয়ে করে, তাহলেও অনেক সময় ‘অনার কিলিং’ হয়। উইকে পিডিয়া জানাচ্ছে ২০১১ সালে পাকিস্থানের মানবাধিকার গ্র“পগুলো ৭২০টি অনার কিলিং (৬০৫ জন নারী এবং ১১৫ জন পুরুষ)-এর তথ্য পেশ করে। পাকিস্থান হিউম্যান রাইটস কমিশনের মতে ২০১০ সালে সারা দেশে ৭৯১টি ‘অনার কিলিং’ সঙ্ঘটিত হয় যেখানে এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের হিসাব মতে সেবছর পাকিস্থানে ৯৬০ জন নারীই মারা গেছেন ‘অনার কিলিং’য়ের জন্য। ১৯৯৮ থেকে ২০০৪ সাল নাগাদ এমন ৪,০০০ মামলা হয়েছে যাদের ভেতর নারী ভিকটিম ছিলেন ২৭০০ এবং ১৩০০ ছিলেন পুরুষ। পাঞ্জাবে ‘অনার কিলিংয়ের’ হার সবচেয়ে বেশি এবং তারপরই সিন্ধু প্রদেশের হার। তুলনামূলক ভাবে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ ও বালুচিস্থানে এই হার কম। পাক প্রধানমন্ত্রী শওকত আজিজের পরামর্শক নীলুফার বানুর মতে ২০০৩ সালে ১২৬১ জন নারী ‘অনার কিলিং’য়ে মারা যায়।

পিতৃতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে নারীকে আজীবন একটি ‘সম্মান সংহিতা (অনার কোড)’ পালন করতে হয়। সতীত্ব রক্ষা, পরিবার বা বংশের সম্মান ও সুনাম রক্ষায়, কখনো ‘পর্দা’র জন্যও নারীকে অনেক বেশি সামাজিক-সাংস্কৃতিক নিয়ন্ত্রণ মানতে হয়। অনেক সময় বোনকে উত্তরাধিকার বা সম্পত্তির ভাগ না দিয়ে ভাইয়ের পুরোটা পাবার আকাঙ্খা, স্ত্রীকে খুন করে পুনর্বিবাহ করার জন্য স্ত্রীর সাথে অন্য পুরুষের ব্যভিচারের অভিযোগ এনে খুন-খারাবিও হয়ে থাকে। পাকিস্থানের মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে ‘অনার কিলিংয়ে’র ভিকটিম বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেই মেয়েরা যারা পরিবারের পছন্দের (অধিকাংশ ক্ষেত্রে কাজিন- চাচাতো/মামাতো/ফুপাতো ভাই) বাইরে নিজের পছন্দে বিয়ে করে; এতে করে বাবা-পিতৃব্য (চাচা)-খালা (মাসী)-ফুপা (পিসা) প্রমুখ মিলিয়ে ‘বৃহত্তর পরিবারের’ ভেতরে সম্পত্তি থাকার যে সম্ভাবনা সেটা ‘অন্য পরিবারে’ চলে যাবার সম্ভাবনায় (যেহেতু মেয়েটি অন্যত্র বিয়ে করলে শরিয়া আইনানুযায়ী কন্যা সন্তানের তার ভাইয়ের অর্দ্ধেক হলেও প্রাপ্য সম্পত্তিটুকু অন্য পরিবারে চলে যাবার সম্ভাবনা থাকে) এই খুনগুলো হয় (http://en.wikipedia.org/wiki/Honour_killing_in_Pakistan)।

অনার কিলিং ভারতেও আছে। আল-জাজিরার হিসেব মতে দেখা যাচ্ছে প্রতি বছর সারা বিশ্বে ৫,০০০ অনার কিলিংয়ের ভেতরে ১,০০০ অনার কিলিং ভারতে হচ্ছে। ভারতের তিনটি বিখ্যাত অনার কিলিং কেসের একটি দেখা যাচ্ছে ১৪ বছরের এক স্কুল বালিকা (আরুশি) ও তাদের বাড়ির পঞ্চাশ বছরের পুরুষ গৃহকর্মী (হেমরাজ)-কে একদিন আপত্তিকর অবস্থায় দেখে মেয়েটির দাঁতের ডাক্তার বাবা-মা’র হাতে দু’জনেরই খুন হওয়া, ২৩ বছর বয়সী ধর্মেন্দ্র বরাক ও নিধি বরাক পরিবারের অমতে পালিয়ে বিয়ে করায়, সেপ্টেম্বর ২০১৩-এ ১৯ বছর বয়সী মীনাক্ষী প্রেমিকের সাথে পালিয়ে যাবার পথে এক পুলিশ কনস্টেবলের হাতে ধরা পড়ে এবং পুলিশ পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেবার পর সে খুন হয় ‘স্বজনে’র হাতে, অক্টোবর ২৪ ২০১৩-এ হরিয়ানার এক পনেরো বছরের মুসলিম মেয়েকে তার প্রেমিকের সাথে দেখা করতে না দেবার জন্য চাচার বাড়িতে লুকানো হয় যেখানে সে পরে খুন হয় ও ২০১৩-এর জুলাইয়ে মহারাষ্ট্রের অরুন বন্ধু ইরকল তার মেয়েকে ‘অন্য কাস্টে’র ছেলের সাথে প্রেমের অপরাধে তার ১৭ বছরের মেয়ে যশোধরাকে এক জোড়া কাঁচি দিয়ে ৪৮ বার আঘাত করে খুন করার জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন (http://www.aljazeera.com/…/honour-killings-india-crying-s ha…)।

পশ্চিমে অভিবাসী এশীয় সম্প্রদায়ের মেয়েরাও শিকার হচ্ছে আপন পিতা-মাতার হাতে। ২০০৭-এ কানাডায় এক পাকিস্থানী ১৬ বছরের কিশোরী পশ্চিমা পোশাক পরতে চাওয়া ও অন্য বন্ধুদের মতো পার্ট-টাইম কাজ করতে চাওয়ার অপরাধে খুন হয় নিজের বাবা-মা’র কাছে। আর এক আফগান মা ১৯ বছরের মেয়েকে সারারাত বাইরে থাকার দায়ে খুন করে। হিন্দু ও শিখ অভিবাসী বাবা-মায়েরাও এমন কাণ্ড করে না তা’ নয় (http://www.canada.com/…/Honour+killings+…/3165638/story .html) ।

বৃটেনে রানিয়া আলায়েদ নামে এক প্যালেস্টাইনী গৃহবধূ ‘পোশাকে’ পশ্চিমা হওয়া ও নিজের কর্মজীবন বেছে নিতে চাইবার অপরাধে স্বামীর হাতে খুন হন (http://www.jihadwatch.org/…/islamic-honor-killing-in-uk-m us…)। এছাড়াও ল্যরা উইলসন নাম্নী এক ১৭ বছরের শ্বেতাঙ্গিনী তার পাকিস্থানী প্রেমিক আশতিয়াক আসগরের পরিবারে তাদের সম্পর্কের কথা জানানোয় পরিবারে ‘নিন্দা ও সম্মানহানির’ ভয়ে আশতিয়াক তাকে খুন করে (http://www.dailymail.co.uk/…/Britains-white-honour-killin g-…)।

আমার প্রথম চাকরি ‘আইন ও সালিশ কেন্দ্র’ নামে একটি এনজিওতে কাজের সময় একটি কেস-স্টাডি পেয়েছিলাম যেখানে ১৭বছরের এক বাংলাদেশী বংশোদ্ভুত বৃটিশ কিশোরী লিপি বেগমতে তার বাবা-মা জোর করে সিলেটে ফেরত আনে ও কোন এক কাজিনের সাথে বিয়ে দেবার চেষ্টা করে। লিপির প্রেমিক ছিল শ্বেতাঙ্গ। অভিবাসী সম্প্রদায়ের মেয়েদের ‘শ্বেতাঙ্গ’ প্রেমিকদের ‘হাত থেকে’ রক্ষা করতে ‘দেশের বাড়ি’ বেড়াতে আনার নাম করে বাবা-মা’র দেশের এমন কোন ছেলের সাথে বিয়ে দেওয়া যার সাথে তার ভাষাগত যোগাযোগও সম্ভব না এমন ঘটনা ক্রমাগত বাড়ছে। বৃটেনে লিপির প্রেমিকের এ্যাপার্টমেন্টে গিয়ে তার চাচা ও ভাইদের হামলার অভিযোগও ছিল। অথচ বৃটেনে গত এক বছরে এক লন্ডনেই ১৪০০ সহ সারাদেশে মোট ৫,২০০ শ্বেতাঙ্গ নর-নারী ধর্মান্তরিত হয়েছে যাদের ৭০ শতাংশই নারী এবং এই ধর্মান্তরিতা নারীদের গড় বয়স ২৭। ২০০১ সালে ৬০,০০০ শ্বেতাঙ্গ ইসলাম ধর্ম গ্রহন করেন যাদের দুই-তৃতীয়াংশই নারী এবং বৃটিশ গণতন্ত্র এটা কিšত্ত মেনে নিচ্ছে। ধর্মান্তরিত শ্বেতাঙ্গদের ভেতর থেকে নিকি রেইলি ব্রিস্টলে একটি রেস্টুরেন্ট উড়িয়ে দেওয়া, রিচার্ড রিড শ্যু বম্বারে পরিণত হওয়া এবং জার্মেইন লিণ্ডসে জুলাই ৭-এর বোমা হামলায় জড়িত থাকলেও অধিকাংশ ধর্মান্তরিত শ্বেতাঙ্গ স্বাভাবিক জীবন যাপন করছে। তবে পশ্চিমা সমাজে অধিকাংশ পরিবারে মা-বাবার বিচ্ছেদ, বিবাহ বিচ্ছেদ আইনে ডিভোর্সী স্ত্রীকে চড়া অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দেবার ভয়ে ভীত শ্বেতাঙ্গ ছেলেদের ক্রমাগত বিয়েতে অনীহা ও সঙ্গীনী পাল্টানো,পশ্চিমা ভোগবাদ, পার্টি-ক্লাব-মদের জীবনও অনেক মেয়েকে এশীয় বা মুসলিম জীবনসঙ্গী খুঁজে নিতে সাহায্য করে।

আজ ফেবুতে এক বাংলাদেশী মুসলিম তরুণী যিনি বৃটেনে এক শ্বেতাঙ্গ ছেলেকে বিয়ে করেছেন তাঁর স্ট্যাটাস থেকে জানলাম গতবছর তাঁর জীবনসঙ্গী বাংলাদেশীদের হাতে আক্রান্ত হয়েছে। বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি মঙ্গোলয়েড গোষ্ঠির নারীদের বিয়েতে বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীকে একসময় অনুপ্রাণিত করা হলেও উল্টোটা কম ঘটে। এক গবেষণার কাজে একবার পার্বত্য চট্টগ্রামে যাবার পর আমার পাশে একটি চাকমা গাইড ছেলেকে দেখে সেটেলাররা এসে বলছিল: ‘আপা- আপনি ত’ বাঙালী চেহারায়- মুসলিম নিশ্চয়? তবে চাকমা ছেলের সাথে ঘুরছেন কেন? নাকি আপনি খ্রিষ্টান? তাই এত ফ্রি?’

এটাই পিতৃতন্ত্র। অং সান সুচির লেখায় মিয়ানমারে বর্মী-ভারতীয় দাঙ্গার কারণ হিসেবে বর্মী নারীদের ক্রমাগত ভারতীয় ছেলে বিয়ে করা ও ক্ষেত্রবিশেষে প্রতারিত হওয়া (যার একটা আদল পাওয়া যায় ‘পথের দাবি’ উপন্যাসে) বর্মী পুরুষের জাত্যাভিমানে আঘাত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে (ফ্রম ফিয়ার টু ফিয়ারলেসনেস)। মূলত: অবিকশিত পুঁজিবাদী ও প্রাচ্যের সমাজে আজো সামন্ত সমাজের নানা রেশ থাকায় পিতৃতন্ত্র এভাবেই তার চূড়ান্ত দাঁত-নখ মাঝে মাঝেই দেখায়। সেটা ‘লাভ জিহাদে’র বিরুদ্ধে ঘোষনার মাধ্যমে হোক আর ‘অনার কিলিংয়ে’র মাধ্যমেই হোক। কাজেই মনু সংহিতায় শুদ্র-নারী-চন্ডাল-কুকু র-কাকের সহাবস্থান আর কোরানের সুরা-নিসায় ‘অবাধ্য স্ত্রীকে প্রথমে শয্যা আলাদা করা ও পরে প্রহারের’ব্যবস্থাপত্ র থাকেই। ইউরোপেও মধ্যযুগে উইচ হান্টে পুড়িয়ে মারা হয়েছে লাখ লাখ নারী। তারা তাও কিছু রিফর্মেশনের ভেতর দিয়ে গেছে। সামান্য হলেও গেছে হিন্দুরাও। বাংলাদেশেও নানা প্রতিকুলতার ভেতর থেকে গেছে এবং যাচ্ছে মুসলিমরা। ১৯৬১ সালে পাক সেনা শাসক আইয়ুব খান অন্তত: একটি ভাল কাজ করেছেন ‘মুসলিম বিবাহ আইন (সংশোধন) অধ্যাদেশ-১৯৬১’ প্রণয়ন করে যার মাধ্যমে দ্বিতীয় বিয়ের আগে মুসলিম পুরুষের প্রথম স্ত্রীর অনুমিত নেওয়া অত্যাবশ্যকীয় হয়। ভারতে হয়তো নানা কারণেই মুসলিম সম্প্রদায়ের ভেতর সেটা হয় নি। কাজেই সেখানে ধর্ম না বদলে দুই সম্প্রদায়ের আন্ত:বিবাহের আইন থাকলেও খোদ সাঈফ আলী খানের বোনের তার অমুসলিম প্রেমিকের সাথে বিয়েটা ঠেকে আছে। হয়তো সাঈফের চাচারা সেখানে বাধা।

উপমহাদেশে সূফী বা সমন্বয়বাদী ইসলামের হাত ধরে যে ইসলাম এসেছিল তার অনেক বড় অবদানও ছিল এখানকার সভ্যতায়। জাত-পাতের কঠোরতা কিছু হলেও ঘোচানো, স্থাপত্য-রন্ধন শিল্প-উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত সহ নানা কিছুতেই যা অবদান রেখেছে। আজকের ওয়াহাবি ইসলামের কট্টরতায় খোদ মসজিদে নামাজরতদের উপর বোমা হামলা করে চরমপন্থীরা। তখন বিদায় হজ্বে মহানবীর শেষ কথা মনে পড়ে: ‘তোমরা ধর্ম লইয়া বাড়াবাড়ি করিও না। অতীতে বহু সম্প্রদায়ই এভাবে শেষ হইয়া গিয়াছে।’

হিন্দু ধর্ম সংগঠিত নয় বলে এবং এর ভেতর তন্ত্র-মন্ত্র-ভুত-প্রে ত-হনুমান-লিঙ্গ-সাপ পূজা থেকে উপনিষদের গুরুগম্ভীর দর্শন অনেককিছু রয়েছে বলে চাইলেও এর পক্ষে ইসলাম বা এমনকি ক্রিশ্চিয়ানিটি বা ইহুদি ধর্মের মত ‘সামরিক’ হওয়া সম্ভব নয়। বিপদের আশঙ্কাও কম। তবু অবিকশিত পুঁজির তথা সামন্তবাদী সংস্কৃতি থেকে যাওয়া দেশে পিতৃতন্ত্র কখনো ‘লাভ জিহাদে’র বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে আর কখনো ‘অনার কিলিং’ করে নিজেকে প্রকাশ করবেই।