গদ্য

দধিমঙ্গল @শাশ্বতী

শাশ্বতী

সেদিন খুব ঠান্ডা ছিল। জানুয়ারীর শেষ সপ্তাহ - কিন্তু কি ঠান্ডা ! মা বরাবর শীতকাতুরে , তায় প্রবল ভিতু, সবেতেই অমঙ্গলের দীর্ঘ ছায়া দেখতে পায়... বারবার মৃদুস্বরে বাবাকে অনুযোগ করে গেছে "কি করে হবে গো সব ! আমাদের একতলা বাড়ি, এতো লোক... কি করে হবে ?"

আমাদের বাড়িটা সত্যিই ছোট - দুকামরার ফ্ল্যাটের মতন । একটাই বাথরুম । শুধু গুণের মধ্যে চারপাশের বাগান, আর বাগানে অজস্র ফুল। সেবছর মরশুমী ফুল ফুটেছিলও প্রচুর ... যেন বাগান আলো হয়ে আছে। পথচলতি প্রতিটা মানুষ আকৃষ্ট হয়েছে। ফুলগুলো কি জানতো আমার রঙের বাক্সে প্যাস্টেল-শেড কমে আসবে এরপর থেকে... হাতে গোনা দু-একটা রঙ ছাড়া আর সব ঝাপসা হয়ে যাবে...আর সব ফ্যাকাসে । তাই হয়তো শেষবারের মতো উৎসব ছড়িয়ে যেতে চেয়েছিল ওরা রঙে রঙে ।

সেদিন খুব ঠান্ডা ছিল । ভোররাত্রে আমাকে যখন ঘুম থেকে তোলা হল তখনও স্বপ্নে স্পষ্ট বকুল-গন্ধ। ওর জামায় যেমন কিছুটা মিষ্টি মিষ্টি ফর্মালিনের গন্ধ পেতাম...যখনই দেখা হত, কি জানি ওই গন্ধের দোষেই কি না - অবশ লাগতো। আজ আবার ঠিক তেমনি গন্ধ ঘর জুড়ে। আমাকে সাজিয়ে গুজিয়ে কাকডাকার আগে বসানো হল প্রদীপের সামনে দইচিঁড়ের সঙ্গে চটকেচটকে মাখা হল কিছু আদি-রসিকতা। গুরুজনদের এমন চটুল হাস্যময়রূপ মধ্যবিত্ত বাঙালীঘরে কালেভদ্রেই দেখা যায়... আমিও দেখছিলাম । বুঝতে চাইছিলাম এই কতোটুকু স্বপ্ন আর কতোটুকু বাস্তব।

আমাদের দুকামরার ফ্ল্যাটের মতো ছোট একতলা বাড়ি, একটাই বাথরুম। কিন্তু সব দিব্যি হয়ে গেল। কোথাও কেউ অভিযোগমাত্র করলোনা। কিংবা অভিযোগ করে লাভ হবেনা জেনে চুপ করে থাকলো। যেমন আমি চুপ করে ছিলাম প্রথমদিন থেকে। তেরো বছর অনেকটা সময়...তাই না! এই তেরো বছর ধরে আমার বেড়ে ওঠা, বড় হওয়া, নারী হওয়াকে ঘিরে থেকেছে বকুলগন্ধ। কতবার ব্যস্ত রাস্তায় চেনা-দৃষ্টির সামনে দাঁড়িয়ে ভেতরে ভেতরে আমার সংযমও ফুলের মতো ঝরে পড়েছে। কিন্তু কোন অভিযোগ ছিলনা কারো কাছেই। সবাই জানে কোলকাতায় বরফ পড়েনা, আমিও জানতাম। তাই উষ্ণতার জন্য কাঙালপনা করতে চাইনি।

সেদিনও আমার ঘুমভাঙা শীতার্ত ঠোঁটে লেগে ছিল আড়ষ্ট হাসি - জানতে পারিনি সেই ভোররাত্রে কলকাতারই এক বেসরকারী হাসপাতালে এক সদ্যোজাতর জন্ম দিতে জেগে রয়েছে বকুল, চটুল হাসিঠাট্টায় বন্ধু-সহকর্মীদের সাথে ঘুম তাড়াচ্ছে। ওও জানতে পারেনি, ভোরের দই আমার হজম হয়নি। একটু পরেই বমি করে উগরে দিয়েছিলাম সব। তখনও ...তখনও তেলওঠা প্রদীপটার সলতের সামনে পাক খাচ্ছে একটা সবুজ গঙ্গাফড়িং - তার গায়ে ফর্মালিনের গন্ধ।