গদ্য

বড়দিন

অলোকপর্ণা

কোথাও ভোর হচ্ছে। ভোরের মানে আমি বুঝিনি। ঠিক কোনটাকে ভোর বলব, কতটা আলো থাকাকে ভোর বলে, বা কতটা অন্ধকারকে ভোর ভাবা যায়। কিন্তু ভোর হচ্ছে।

আনন্দরা বদলে ফেলে রঙ, পালক, বাকল বা খোলস
দুঃখেরা একই থেকে যায়...

২৪ শে ডিসেম্বর এক পাটি মোজা ইচ্ছে করে মা- বাবার ঘরেই ঝুলিয়ে রেখে আসতাম, যাতে আনন্দদের ওর মধ্যে ঢুকে পড়তে কষ্ট করতে না হয়। মোজার আরেক পাটি থাকত আমার ঘরের জানালায়, তাতে কখনও কিছু জমা পড়ত না কোনো ভোরবেলা, বোধ হয় সেই মোজাটা মাপের থেকে ছোট ছিল অনেক।
এখন আর মা বাবার ঘরে মোজা রাখি না। মা বাবা একই আছে, যেমন চিরকাল থেকে যায়। তবে আমার ঘরের জানালায় মোজাটা আজও ঝোলে। এবং মোজাটা আজও মাপের থেকে অনেক অনেকটাই ছোট। মাপ মতো মোজা এখনও বাজারে ওঠেনি। খোঁজ জারি আছে।

হতাশের মোজা পরে... পাহাড়ের গা থেকে, প্রতিধ্বনিরা ফিরে আসে,

আমার তিন চার জন বন্ধু আছে। কেউ কোলকাতায়, কেউ পুনে, কেউ হায়দরাবাদ। তিন চার জন একসাথে দেখা হয় না বেশ ক’বছর। হোয়াটসঅ্যাপে আসে পাম কেক, সান্তা ক্যাপ, নলেন গুঁড়ের সন্দেশ। হোয়াটসঅ্যাপেই আসে মেরি খ্রিস্টমাস, জিঙ্গল অল দা ওয়ে। মাঝরাতের টেক্সটে, “তোর জামায় পিছন থেকে পটাসিয়াম পারম্যাঙ্গানেটটা শ্রীরূপা নয়, আমিই ফেলেছিলাম।” বা “বাঁ পায়ে ছটা স্টিচ, ডাঃ বলেছে বেড রেস্ট।” তারপর একসময় তিন চার জন ঘুমিয়ে গেলে চুপিচুপি আমি গ্রুপে ঢুকে আসি। দেখি পাহাড়েরা মাথা তুলে আছে, কেউ কোলকাতায়, কেউ পুনে, কেউ হায়দরাবাদ।

পৃথিবীর সমস্ত বৃক্ষের পাশে বসে, কাছে বসে, কাঁদা যায়।

খ্রিস্টমাসে ভিক্টোরিয়া থেকে হেঁটে হেঁটে পার্ক্সট্রিট যাওয়ার পথে, ডায়েরিটা কিনেছিলাম। নকল চামড়ায় বাঁধানো, জলছাপ মারা পৃষ্ঠা। আমি কোনোদিন নিয়মিত ডায়েরি লিখে উঠতে পারিনি। দরকার মেটাতে মাঝে মধ্যে এসে বসেছি ডায়েরি তীরে। সোনাঝুরি ডাকনামের ডায়েরিটা আমার টেম্পোরারি বইয়ের তাকে বিড়ালের মত সারাটাদিন পড়ে পড়ে ঘুমোয়। ওর কোনো দিন নেই। ওর কাছে সমস্তটাই একটা গোটা রাত।

পাখি ডেকে ওঠে কোথাও। বুঝি ভোর হচ্ছে, বুঝি, রাতের অভ্যাসটা যখন জোর করে গা থেকে ঝেড়ে ফেলতে হয়, তাকেই ভোর বলে, তখনই ভোর হয়।
ভোর হচ্ছে, বাইরে। আজ বড়দিন।
আমার জানালায় মোজাটা নড়ে নড়ে ওঠে, বুঝি শীতের হাওয়া ঢুকে পড়েছে ওর মধ্যে। হাওয়াদের মুক্তি দিতে জানালার দিকে এগিয়ে যাই, যেখান দিয়ে একটু পরেই আলো ঢুকবে।
তখন আর ভোর নেই, তখন সকাল।